আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশী কমিউনিটি - Bangladeshi Community in Ireland
আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশী কমিউনিটি

(Bangladeshi Community in Ireland)



আয়ারল্যান্ডে স্কুলের ছেলেমেয়েদের কি স্কুলের বাইরে কোচিং এর প্রয়োজন আছে?

আয়ারল্যান্ডে স্কুলের ছেলেমেয়েদের কি স্কুলের বাইরে কোচিং এর প্রয়োজন আছে?

আমি গত ২৭ বছর ধরে ডাবলিনে পরিবার নিয়ে বাস করি। আমার দুই সন্তানের জন্ম ও বেড়ে উঠাও এই দেশে। ফলে অনেকেই আমাকে একটা প্রশ্ন করেন। “আয়ারল্যান্ডে স্কুলের ছেলেমেয়েদের কি স্কুলের বাইরে কোচিংয়ের প্রয়োজন আছে?” কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরে এক কথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা যাবে না। কেননা, উত্তরটা নির্ভর করবে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর। যেমন,

  1. আপনার ছেলে বা মেয়ে কোন ক্লাসে পড়াশোনা করছে?
  2. আপনার ছেলে বা মেয়ে পড়াশোনায় দুর্বল কিনা?
  3. আপনার ছেলে বা মেয়ের পড়াশোনা ব্যাপারে টার্গেট বা লক্ষ্য কি? অর্থাৎ সে বড় হয়ে কি হতে চায় বা ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে সে কোন বিষয়ে পড়াশোনা করতে চায়।
আমি এক এক করে এখানে বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমেই আসি প্রাথমিক স্কুল প্রসঙ্গে।

প্রথম পর্বঃ প্রাথমিক স্কুল পর্যায়

এদেশের প্রাথমিক স্কুলের সামগ্রিক পরিবেশ এবং পড়াশোনার মান অনেক উন্নত। ছেলেমেয়েরাও আনন্দের সাথে এখানে পড়াশোনা করে। আর স্কুল প্রিন্সিপাল, ক্লাস টিচার সকলেই দায়িত্বের সাথে ছেলেমেয়েদের অনেক যত্ন নিয়ে থাকেন। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, খেলাধূলা, নিয়ম-শৃংখলা সকল ক্ষেত্রেই তাঁরা সাধ্যমতো লক্ষ্য রাখেন এবং চেষ্টা করেন সর্বোচ্চ শিক্ষা ও সেবাটা দেবার। তাই আপনার ছেলে বা মেয়ে যদি প্রাথমিক স্কুলে পড়ে তাহলে এক কথায় বলা যায়, ছেলে বা মেয়ের স্কুলের বাইরে কোনো কোচিংয়ের দরকার নেই। তাদেরকে শুধু বাসায় যত্ন নিলেই চলবে। কিন্তু এখানে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের উপর। স্কুলেও এই দুটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এবং ক্লাস টিচারও একটা রেকর্ড রাখেন তাঁর ক্লাসে কোন ছেলে বা মেয়ে কে কেমন করছে। অনেক সময় যে সব ছেলে বা মেয়ে এই বিষয় দুটিতে দূর্বল তাদেরকে এক্সট্রা টিচার দিয়ে আলাদা ক্লাসও নেয়া হয়। কিন্তু তারপরও যদি আপনার ছেলে বা মেয়ে এই বিষয় দুটিতে দুর্বল থাকে, তাহলে তাকে স্কুলের বাইরে কোচিংয়ে দেয়া যেতে পারে। হয়তো দেয়া উচিৎও হবে। কেননা, ভবিষ্যৎ পড়াশোনার ক্ষেত্রে এই বিষয় দুটির গুরুত্ব অপরিসীম।

দ্বিতীয় পর্বঃ মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়

এদেশে মাধ্যমিক স্কুলে প্রায় দশটির মতো বিষয় পড়তে হয়। তন্মধ্যে গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান ও একটি বিদেশী ভাষা (ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ বা জার্মান) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়গুলি উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়েও পড়তে হয়। অতএব, এই বিষয়গুলির উপর খুব ভালো দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তবে এই পর্যায়ে আমি সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিই গণিতের উপর। কেননা, আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি এদেশের বেশীরভাগ ছেলেমেয়েরা গণিতে বেশ দূর্বল। আমার মতে, নিম্নোক্ত কিছু কারনে ছেলেমেয়েরা গণিতে দূর্বল হতে পারে।

  1. কোনো কারনে প্রাথমিক স্কুলে গণিতের ভিত্তি মজবুত না হওয়া।
  2. গণিতের প্রতি অহেতুক ভীতি কিংবা অনীহা।
  3. ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা না করে শুধুমাত্র কঠিন বা কষ্টদায়ক ভেবে উচ্চতর গণিত ছেড়ে সাধারন গণিত নির্বাচন।
  4. স্কুলে শ্রেনীকক্ষের পাঠদান সময় অপর্যাপ্ত।
  5. ক্যালকুলেটরের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা।
  6. গণিতের সকল সূত্রাবলী লগ বই আকারে পরীক্ষার সময় বিতরন।
  7. কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুযোগ্য শিক্ষকের অভাব।
যাহোক, আমার কথা হল, মাধ্যমিক স্কুলের ছেলেমেয়েরা কম বয়সী। স্বভাবতই ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করার মতো জ্ঞান তা্দের নেই। সুতরাং অভিভাবকদেরকেই এই ব্যাপারে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে। ছেলেমেয়েদের গণিতের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। যদি কোনো ছেলে বা মেয়ে গণিতে দুর্বল থাকে, তাহলে তাকে অবশ্যই অবশ্যই স্কুলের বাইরে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষভাবে বলতে হয়, মাধ্যমিক স্কুলের শেষ বর্ষে অর্থাৎ থার্ড ইয়ারে এই কোচিং খুবই উপকারী।

তৃতীয় পর্বঃ উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়

আয়ারল্যান্ডে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা হচ্ছে খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের দুই বছরের পড়াশোনা শেষে লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন এবং কর্মজীবন। কোনো ছেলে বা মেয়ে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে কি পারবে না, কিংবা কোন বিষয়ে পড়তে পারবে তা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে এই লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষার ফলাফলের উপর। যে কারনে প্রতি বছর অনেক ছেলেমেয়েদে্রকে দেখেছি লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষা রিপিট (পুনরায়) করতে। কেননা, সে কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে কিংবা পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।

মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুলের ছেলেমেয়েদেরকে প্রায় দশটির মতো বিষয় পড়তে হয়। কিন্তু উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তে হয় কমপক্ষে ছয়টি বিষয়। সাধারণত পাবলিক বা সরকারী স্কুল সর্বোচ্চ সাতটি বিষয় পড়ার সুযোগ দেয়। তবে কেউ ইচ্ছা করলে স্কুলের বাইরে নিজ উদ্যোগে অতিরিক্ত আরও বিষয় পড়তে ও পরীক্ষা দিতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে ভালো ছয়টি বিষয়ের নম্বর পরীক্ষার ফলাফলের সাথে যোগ হবে। লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষার বিষয়গুলি এবং এর ফলাফলের সাথে কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের অঙ্গাংগীন সম্পর্ক রয়েছে। এজন্য অনেক ছেলেমেয়েরাই স্কুলের বাইরে নিজ খরচে অতিরিক্ত আরও কয়েকটি বিষয় পড়ে।

লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষার মোট নম্বর হল ৬২৫ । ছয়টি বিষয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ । আর উচ্চতর গণিতের জন্য বোনাস ২৫ নম্বর। সুতরাং এটা সহজেই বোধগম্য যে, লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের ক্ষেত্রে উচ্চতর গণিতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, গণিতের উপর শিক্ষাজীবনের খুব প্রথম থেকেই অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এর বিকল্প নেই। গণিতের পরেই আসে ইংরেজি। একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো বিষয়ে পড়তে হলে ইংরেজিতেও খুব ভালো নম্বর থাকা চায়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে একটি বিদেশী ভাষায় দক্ষতাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

এবার আমার লেখার মূল প্রশ্নে আসি। উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলের ছেলেমেয়েদের কি স্কুলের বাইরে কোচিংয়ের প্রয়োজন আছে? এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর হল হ্যাঁ, অবশ্যই। লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে হলে প্রতিটি বিষয়েই স্কুলের বাইরে কম-বেশী কোচিং করতে হবে। প্রতি বছর লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষার ঠিক পূর্বে ইস্টার হলিডের সময় অনেক কোচিং (গ্রাইন্ড) স্কুল প্রতিটি বিষয়ে বিশেষ কোচিংযের ব্যবস্থা করে। লিভিং সার্টিফিকেট পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর অর্জনের জন্য এই কোচিং খুব উপকারী। তাই অন্ততপক্ষে এই সুযোগ গ্রহণ করা উচিত।

সবশেষে আলোচনা করবো গণিতের কোচিং সম্পর্কে। আমার অভিজ্ঞতা বলে আয়ারল্যান্ডের বেশীরভাগ স্কুলের ছেলেমেয়েরাই গণিতে অপেক্ষাকৃত দূর্বল। এর সম্ভাব্য কারনসমূহ আমি এই লেখার দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করেছি। অতএব আমার উপদেশ হল, উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলের ছেলেমেয়েদেরকে একেবারে প্রথম থেকেই গণিতের কোচিংযের ব্যবস্থা করা। লেখাপড়ার তুলনায় উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুলের সময় খুব সীমিত, অপ্রতুল। তাই হাতে সময় থাকতেই সুন্দর ও সময়োপযোগী প্লান করতে হবে।

লিভিং সার্টিফিকেট (উচ্চ-মাধ্যমিক) পরীক্ষায় উচ্চতর গণিতের গুরুত্ব

(বিস্তারিত এখানে)


(বিস্তারিত এখানে)